মেঘলা আক্তার শান্তা 
 
 
মেঘলা আক্তার শান্তা বর্তমানে বাল্য বিবাহরোধে তার এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন। ওয়ার্ল্ড ভিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ ব্যাপারে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
 
মেঘলার দেয়া তথ্যমতে, তার এলাকায় ১০ থেকে ১৬ বছরের প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার। বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ মেয়ে তাদের জীবনে সুখী নয় কিংবা অল্প বয়সেই মা হয়ে যাচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে মেঘলা তার এলাকায় বিভিন্ন সভা, সেমিনার করে সচেতনতা বৃদ্ধি করে যাচ্ছেন। এছাড়া মানুষ যেন তাদের কথা আরও বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই কারণে সে বিভিন্ন জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমেও সচেতনতার ব্যাপারগুলো প্রচার করেন।
 
cm_bangladesh_day_12c_april_29-116.jpg
শুধু অভিভাবক নয়, মেঘলা কিশোর-কিশোরীদেরও এই ব্যাপারে সচেতন করে যাচ্ছেন। বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো সবার সামনে তুলে ধরছেন যাতে  সকলে বুঝতে পারে যে কেন বাল্যবিবাহ খারাপ, কেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেয়া উচিত নয়।
 
মেঘলার বয়স যখন ১৩ বছর, তখন তিনি একটি দূর্ঘটনার শিকার হন। তাকে জোর করে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় সেসময়। মেঘলা ছোট থেকেই একা চলাফেলা করতে অভ্যস্ত ছিলেন, তিনি তখন থেকেই ওয়ার্ল্ড ভিশনের সঙ্গে কাজ করতেন। তাই সঙ্গত কারণেই তার বাসায় আসতে দেরি হয়ে যেতো, তিনি বেশিরভাগ সময়ে তার কাজের কারণে বাসার বাইরেই থাকতেন। সে কারণে মোঘলার এলাকার লোকজন মেঘলাকে অপছন্দ করতো। "মেয়ে মানুষ এত বাইরে বাইরে কী"- এ ধরণের কথা মেঘলাকে প্রায়শই শুনতে হতো।
 
cm_bangladesh_day_12c_april_29-695.jpg
শুধু কথা শুনিয়েই তারা ক্ষান্ত দেয় নি, মেঘলার মা'কেও তারা মেঘলাকে নিয়ে ভয় দেখিয়েছেন। "মেয়ে মানুষ একা একা চলাফেরা করে, কখন কী না কী বিপদ হয়ে যায়! বিয়ে দিয়ে দেয়াই ভালো" এসব বলে বলে তারা মেঘলার মা'কে মেঘলাকে বিয়ে দেয়ার জন্য জোরাজুরি করতে থাকে। এর ফলস্বরূপ একসময় মেঘলার মা'ও মেঘলার অনিচ্ছায় তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। 
 
মেঘলা যখন কোনোভাবেই মাকে বোঝাতে পারছিলেন না, তখন তিনি অন্যভাবে চেষ্টা করলেন। মেঘলা বিয়ের আগের দিন পরীক্ষা দেয়ার জন্য বেরিয়ে আর বাড়িতে ফিরে গেলেন না, এক বন্ধুর বাড়িতে থেকে গেলেন। তারপর যখন বিয়ের সময় পেরিয়ে গেলো, তখন সে বাড়িতে গেলেন। সে এই ঘটনার মাধ্যমে তার বিয়ে তো আটকাতে পারলেন, কিন্তু তার পরিবারের কেউই তখন তাকে সমর্থন করে নি। এমনকি তার মা পর্যন্ত তার সাথে তিনমাস কথা বলেন নি। এই ঘটনার পরই মূলত বুঝতে পারে যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার গুরুত্ব।
 
 
মেঘলার এই কাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যখন বিয়েতে ছেলে-মেয়েরা রাজি হয়ে যায়, তখন তাদের ওই জায়গাটা থেকে ফেরানো। বাবা-মায়েরাও অনেকসময় মুখের ওপর বলে দেন, "আপনার মেয়েকে খাওয়ানোর-পরানোর পয়সা নেই। সেই পয়সা কি তুমি দেবে?" মেঘলারা অনেক সময় তাদের জন্য বেশ কিছু কাজে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ছাড়া কোনো আর্থিক সাহায্য দিতে পারে না। তাই সেই পরিস্থিতিতে একেকটা বিয়ে বন্ধ করা তার জন্য সত্যিই খুব কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়।
 
তাছাড়া বেশিরভাগ বাল্যবিয়েই মা-বাবা রাতে সবার অগোচরে দিতে চায়। আবার অনেক মা-বাবা বাল্যবিবাহ দেয়ার জন্য মেয়ের আরেকটা জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি করে নেন, যেখানে মেয়ের বয়স আঠারোর উপরে দেয়া থাকে। এমনকি মেঘলার নিজেরও নকল একটি জন্মনিবন্ধন আছে, যেখানে তার বয়স ২১ দেয়া। সে কারণেও কাজগুলো করা তার জন্য খুবই শক্ত। 
 
IMG6674
মেঘলারা যখন কোনো বাল্যবিবাহের সংবাদ পায়, তখন প্রথমে নিজেরাই যায় সেখানে কথা বলার জন্য। যদি বিয়ে বাবা-মা ঠিক করে থাকে তবে বাবা-মার সঙ্গে, আর যদি নিয়ে ছেলে-মেয়ে নিজেরা ঠিক করে থাকে কিংবা নিজেরা রাজি হয়ে যায় তবে তাদের সঙ্গে কথা বলে। তাদেরকে বোঝায়। যদি বোঝানোর পরেও তারা মানতে নারাজ থাকে, তবে তাদেরকে মেঘলা আইনী প্রক্রিয়ার ভয় দেখায়। কারণ, কোনো শিশু ১৮ বছরের আগে বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না। আর মা-বাবাও আঠারোর আগে তার সন্তানকে বিয়ে দিতে পারেন না। তাই আইনের ভয় দেখিয়ে তারা অনেক বিয়ে আটকাতে পারে।
 
মেঘলার কাজে তাকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন দেয় ওয়ার্ল্ড ভিশনের সকলে , তার বন্ধু এবং তার শিক্ষকেরা। তার একজন শিক্ষক তো রীতিমত তার মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে আবার তাকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন!
 
মেঘলার মতে বল্যবিবাহ বন্ধের জন্য অসচেতন মানুষজনকে সচেতন করতে হবে। আর আর্থিকভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ পরিবারকে করতে হবে আর্থিক সাহায্য। তাহলেই এই অভিশাপ থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব।
 
আমাদের দেশে মেয়েদেরকে বোঝা মনে করা হয়। পরিবারে সমস্যা যাই থাকুক না কেন, সমাধান একটাই - মেয়ের বিয়ে দাও! সম্প্রতি মেঘলার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মেঘলার মা মেঘলাকে একটি বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন এখন আর মেঘলার পড়াশোনার খরচ তিনি বহন করতে পারবেন না। কিন্তু মেঘলা বিয়ে করে নিয়ে তার স্বামীর টাকায় সে পড়াশোনা করতে পারবে। মেঘলার মা কিন্তু বলে নি, তুমি চেষ্টা করো নিজের খরচ নিজে চালানোর, তুমি চেষ্টা করো পরিবারে সাহায্য করতে। বরং তার মা তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে চেয়েছে। শুধু তাকেই বিয়ে দিয়ে খরচ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে, তার ভাইকে কিন্তু বিয়ে দিতে চায় নি! এইক্ষেত্রে মেঘলাকেও তার মা বোঝা মনে করছে। তাই মেঘলা জোর গলায় বলে, "আমরা বোঝা হতে চাই না। আমরা একেকজন সম্ভবনা! আমাদেরকে কেন বোঝা মনে করা হচ্ছে?"
 
মেঘলার সংগঠন "শিশু কন্ঠ শিশু ফোরাম" থেকে তারা ১৮ মাসে মোট ১৩ টা বিয়ে বন্ধ করেছে। এবং গতমাসে দুটোসহ মেঘলা ব্যক্তিগতভাবে সাতটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছেন। 
সম্প্রতি আঠারোতে পা দেয়া মেঘলার সমাজ বদলে দেয়ার মতো সচেতনতামূলক কাজের জন্য সে অশোকার একজন 'ইয়্যূথ ভেঞ্চার' হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। যার মাধ্যমে তার কাজকে সে আরও বেশি গতিশীল এবং বিস্তৃত করার সুযোগ পেয়েছে।
মেঘলা বর্তমানে বাল্যবিবাহ বন্ধ এবং যারা এর মধ্যেই বাল্যবিবাহের শিকার, তাদের বাল্য মাতৃত্ব রোধে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছে। সেই সাথে সে চায় অস্বচ্ছল মেয়েদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এবং বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব নিতে পারে, কারো জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়। মেঘলা চায় একটি সচেতন শিশুবান্ধব সমাজ তৈরি হোক আমাদের মাধ্যমেই, যেখানে কোনো শিশু-কিশোর বাল্যবিবাহের শিকার হবে না, যেখানে প্রতিটি শিশু একটি সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে উঠবে, যেখানে নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলবে একটি সুন্দর বাংলাদেশ!
 
Written  - Alamgir Kabir

More For You